সমুদ্রের নীল বিস্তারে নির্ভীকভাবে এগিয়ে চলেছে এক ব্যতিক্রমী ভারতীয় অভিযান। ইঞ্জিনহীন, ধাতব পেরেকবিহীন, সম্পূর্ণ প্রাচীন ভারতীয় নৌপ্রযুক্তিতে নির্মিত জাহাজ INSV কৌণ্ডিন্য বর্তমানে উচ্চ সমুদ্রে তার ঐতিহাসিক যাত্রা সম্পন্ন করছে। এই যাত্রা শুধু একটি নৌঅভিযান নয়, এটি ভারতের হাজার বছরের সামুদ্রিক ঐতিহ্য, নাবিক দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক গৌরবের জীবন্ত পুনরুত্থান।
INSV কৌণ্ডিন্য তৈরি হয়েছে প্রাচীন ‘স্টিচড শিপ’ প্রযুক্তিতে, যেখানে কাঠের তক্তাগুলি নারিকেল কোয়ার দিয়ে সেলাই করে জোড়া লাগানো হয়েছে। কোনো আধুনিক ইঞ্জিন বা ধাতব কাঠামো ছাড়াই এই জাহাজ সমুদ্রযাত্রার উপযোগী করে তোলা হয়েছে। এর নকশার অনুপ্রেরণা এসেছে অজন্তা গুহার প্রাচীন চিত্রকর্ম থেকে, যা প্রমাণ করে যে বহু শতাব্দী আগেই ভারতীয়রা উন্নত নৌপ্রযুক্তিতে পারদর্শী ছিল। প্রাচীন জ্ঞানকে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে এই জাহাজকে সমুদ্রোপযোগী করা হয়েছে, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন স্পষ্ট।
গুজরাটের পোরবন্দর বন্দর থেকে ওমানের মাস্কাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে INSV কৌণ্ডিন্য। এই সমুদ্রপথ ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাচীনকালে এই পথ ধরেই ভারত পশ্চিম এশিয়া ও আরব বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বজায় রাখত। আজ সেই প্রাচীন রুটে আবার ভারতের পতাকা উড়ছে, বহন করে নিয়ে যাচ্ছে অতীতের স্মৃতি ও ভবিষ্যতের আত্মবিশ্বাস।
এই অভিযানে অংশ নেওয়া নাবিক দল প্রতিনিয়ত সমুদ্রের প্রতিকূল আবহাওয়া, ঢেউ ও বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে চলেছেন। তাঁদের ধৈর্য, সাহস ও দলগত সমন্বয় এই যাত্রার মূল শক্তি। সমুদ্রের মাঝখানে থেকেও তাঁদের মনোবল অটুট, যা গোটা দেশের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।
নতুন বছর ২০২৬ শুরুর প্রাক্কালে এই ঐতিহাসিক যাত্রা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেও। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী INSV কৌণ্ডিন্য দলের পাঠানো একটি ছবি পেয়ে গভীর আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সমুদ্রের বুকে থেকেও নাবিকদের মুখে যে উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছে, তা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। নতুন বছরের সূচনায় এই দৃশ্য দেশবাসীর জন্য গর্বের এবং এটি ভারতের সামুদ্রিক ঐতিহ্যের শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বার্তায় INSV কৌণ্ডিন্য দলের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে কামনা করেন, তাঁদের যাত্রার বাকি অংশ যেন আনন্দ, সাফল্য ও নিরাপত্তায় ভরপুর হয়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, এই অভিযান কেবল একটি নৌযাত্রা নয়; এটি ভারতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর থেকে আসা এই স্বীকৃতি নাবিকদের মনোবল আরও দৃঢ় করেছে এবং এই অভিযানের গুরুত্বকে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে তুলে ধরেছে।
INSV কৌণ্ডিন্যের এই যাত্রা ভারতীয় নৌবাহিনীর বৃহত্তর লক্ষ্যকেও সামনে আনে—ভারতের সামুদ্রিক ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করা। এটি অতীতের স্মরণমাত্র নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলার ঘোষণা।
সমুদ্রের বুকে ভেসে চলা INSV কৌণ্ডিন্য যেন নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে—ভারতের ইতিহাস আজও চলমান, জীবন্ত এবং বিশ্বকে পথ দেখানোর ক্ষমতা রাখে। এই যাত্রা শেষ হলে তা শুধু একটি অভিযানের সমাপ্তি হবে না, বরং ভারতীয় সামুদ্রিক গৌরবের ইতিহাসে এক নতুন, উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
0 মন্তব্যসমূহ