Advertisement

Responsive Advertisement

জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চের উদ্যোগে আগরতলায় বিশাল মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত

আগরতলা, ২৬ ডিসেম্বর : সংবিধানের ৩৪২ নম্বর ধারায় সংশোধন করে জনজাতি জনজাতি অংশের মানুষ যারা নিজেদের ধর্ম পরিবর্তন করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করেছেন তাদের ST তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে সারা দেশব্যাপী আন্দোলন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চ ত্রিপুরার উদ্যোগে রাজধানী আগরতলায় একটি মিছিল ও সভা অনুষ্ঠিত হয়।
এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহকুমা, ব্লক থেকে জনজাতি অংশের সাধারণ মানুষ এই মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। শহরের তিনটি জায়গা থেকে তিনটি মিছিল আসে। এগুলো হল ক্ষুদিরাম বসুর স্কুল, উমাকান্ত একাডেমী এবং রাধানগর স্ট্যান্ড থেকে মিছিল এসে পৌঁছায় আস্তাবল মাঠে। প্রায় ৫ হাজার বিভিন্ন বয়সে জনজাতি অংশের মানুষ তাদের চিরাচরিত পোশাকে এদিনের কর্মসূচিতে শামিল হয়েছিলেন।
এই সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পদ্মশ্রী বিক্রম বাহাদুর জমাতিয়া, জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চ আসামের কনভেনার বিনোদন কুমবাং, মধ্যপ্রদেশের প্রাক্তন জেলা বিচারপতি প্রকাশ সিং উইকে, ত্রিপুরার জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চের কনভেনার কার্তিক ত্রিপুরা প্রমূখ। সংগঠনের মিডিয়া কোর্ডিনেটর পার্বতী দেববর্মাও ছিলেন এ দিনের এই কর্মসূচিতে।
পদ্মশ্রী বিক্রম বাহাদুর জমাতিয়া বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জনজাতি অংশের সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলেন ভাষা ধর্ম সংস্কৃতি এবং পরম্পরাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এর জন্য সরকার কিংবা কোন সংগঠনের প্রয়োজন নেই। কারণ যে মানুষ যে ভাষায় কথা বলেন তাকে সেই ভাষাতে কথা বলতে হবে। যে মানুষের পরম্পরা যেমনটা হওয়া উচিত তাকে সেই পরম্পরা পালন করতে হবে। সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রেও সেই বিষয়টাই প্রযোজ্য। কারণ প্রত্যেকের কাছেই তার সংস্কৃতি ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চের এই আন্দোলন কেবলমাত্র রাজধানী আগরতলাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এবারে এই আন্দোলন দিল্লিতেও করা হবে । এই দাবী সম্বলিত স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হবে দেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রীকে। সংবিধানের ৩৪২ নম্বর ধারা পরিবর্তন করে জনজাতিদের ভাষা ধর্ম সংস্কৃতি পরম্পরা সুরক্ষিত করার জন্যই এই স্মারকলিপি তুলে দেওয়া হবে। জনজাতি অংশের যে সমস্ত মানুষ নিজেদের ধর্ম সংস্কৃতি এবং পরম্পরা পালন করছে না সেই সমস্ত মানুষদের জনজাতিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্যই সংবিধান সংশোধনের দাবি তাদের। কোন ধর্ম কিংবা কোন জাতি তাদের লক্ষ্যমাত্রার বিষয়বস্তু নয়। তাদের এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। এরপর দীর্ঘদিন তাদের এই আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে পড়ে। ২০০৬ সাল থেকে তারা এই আন্দোলন পুনরায় শুরু করে। এরপর থেকে ১৮ বছর ধরে তারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে জনজাতি অংশের মানুষদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সকলের একটাই বক্তব্য জনজাতি অংশের সাধারণ মানুষের ধর্ম সংস্কৃতি পরম্পরা বাঁচিয়ে রাখতে হলে যারাই এই ধর্ম সংস্কৃতি এবং পরম্পরা মানছেন না তাদেরকে জনজাতিদের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। 
আরো বলেন এই আন্দোলন শুধু মাত্র ত্রিপুরায় হচ্ছে এমনটা নয়। ত্রিপুরার বাইরে ইতিমধ্যে কমপক্ষেও ২২ টি রাজ্যের ২২ টি জায়গায় কর্মসূচী হয়েছে। ২৪ ডিসেম্বর ঝাড়খণ্ডে হয়েছিল এই কর্মসূচী । যেখানে লক্ষাধিক জনজাতি অংশের মানুষের সমাগম ঘটেছিল। এর আগে ২৬ মার্চ আসামে একটি সভা করা হয়েছিল। সেখানে ৬৮ হাজার জনজাতি অংশের মানুষের সমাগম ঘটেছিল। সংবিধানে জনজাতিদের ধর্ম সংস্কৃতি পরম্পরা সুরক্ষিত করার জন্য ১৯৬৭ সালে বিহারের তৎকালীন সাংসদ কার্তিক ওরাং সংসদে দাবি তুলে ছিলেন। তিনি তখন ৩৪৮ জন সাংসদদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে এক জে পি সি গঠন করার জন্য সরকারকে বাধ্য করেছিলেন। সেই জে পি সি একটি রিপোর্টও তৈরি করার পর তা পেশ করেছিল। সেই রিপোর্টে দেখা গিয়েছিল বিদ্যালয় কিংবা চাকরি ক্ষেত্রে সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ৮০ শতাংশ দখল করে রেখেছিল জনজাতিদের ভিন্ন অংশের মানুষ। তিনি আরো বলেন জনজাতি অংশের সাধারণ মানুষের ভাষা ধর্ম সংস্কৃতি এবং পরম্পরা তাদের নিজেদের একটা পরিচয়। এই ভাষা ধর্ম সংস্কৃতি এবং পরম্পরা যদি কেউ ত্যাগ করে থাকেন তখন তার কোন পরিচয় থাকে না, তারা অন্য সংস্কৃতির অনুসারী হয়ে যায়। জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চের লক্ষ্যবস্তু কাউকে আঘাত করা নয়। লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে তাদের ভাষা ধর্ম সংস্কৃতি এবং পরম্পরাকে সুরক্ষিত করা। কিন্তু বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে তাদের এই দাবি এবং আন্দোলনকে বিকৃত করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চ ভারত এবং জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চ ত্রিপুরা জনজাতিদের ধর্ম সংস্কৃতি পরম্পরা সুরক্ষিত করার জন্য সংবিধানের ৩৪২ নম্বর ধারায় সংশোধন আনার দাবি নিয়ে যে লড়াই শুরু করেছে তা নিজেদের ধর্ম সংস্কৃতি পরম্পরা পালন করা জনজাতি অংশের মানুষদের স্বার্থ সুনিশ্চিত করার জন্যই। এই আন্দোলন কোন রাজনৈতিক দল কিংবা কোন সংগঠনের জন্য নয়। এই আন্দোলন কেবলমাত্র জনজাতি অংশের ভাষা ধর্ম  সংস্কৃতি পরম্পরা বাঁচিয়ে রাখার জন্য জন্য। এখনো প্রায় দেশের মধ্যে ১২ কোটি জনজাতি অংশের মানুষ রয়েছেন। যারা এখনো নিজেদের ভাষা ধর্ম সংস্কৃতি এবং পরম্পরা পালন করে চলেছে। তাদের জন্যই এই লড়াই। ত্রিপুর ক্ষত্রিয় সমাজের সমাজপতিরাও উপস্থিত ছিলেন এদিনের এই কর্মসূচিতে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন জনজাতিগোষ্ঠীর নেতারাও ছিলেন মিছিল এবং সমাবেশে। 
কার্তিক ত্রিপুরা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন তারা ইতিমধ্যে তাদের এই দাবি পূরণের জন্য দেশের ২২টি রাজ্যে কর্মসূচি করেছেন। আগামী দিনের দিল্লিতে এই দাবি পূরণের জন্য কর্মসূচির আয়োজন করা হবে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কাছেও ডেপুটেশন প্রদান করা হবে। তপশিল জাতি অংশের মানুষ তাদের ধর্ম পরিবর্তন করলে SC তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়, অথচ জনজাতি অংশের মানুষ নিজেদের ধর্ম পরিবর্তন করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করলে ST তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় না সংবিধান পরিবর্তন করে তাদেরকে তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। এদিনের কর্মসূচিটির দারুন ভাবে সফল হয়েছে। কর্মসূচিতে বানচাল করার জন্য একাংশ দুষ্টচক্র নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বহু জায়গায় গাড়িগুলিকে আগাম বুকিং করার পরও তাদেরকে ভয় ভীতি দেখে আসতে দেওয়া হয়নি। না হলে আরও ব্যাপক অংশের মানুষ কর্মসূচিতে শামিল হতেন। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ